পৃথিবীর সেরা শিক্ষক মা, সেরা ছাত্র-ছাত্রীও-মা

কামরুল ইসলাম

‘একজন মা একটি সন্তানের জন্ম দেন; কিন্তু একজন আদর্শ মা একটি জাতির ভবিষ্যৎ জন্ম দেন।’

পৃথিবীতে মানুষ যতদিন থাকবে, ততদিন শিক্ষকতার ইতিহাস লেখা হবে। সভ্যতার ইতিহাসে অসংখ্য শিক্ষক এসেছেন, জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, যুগকে আলোকিত করেছেন। কিন্তু এমন একজন শিক্ষক আছেন, যিনি কোনো বেতন নেন না, কোনো পদবি দাবি করেন না, কোনো পুরস্কারের প্রত্যাশা করেন না। তবুও তিনিই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। আর তিনি হলেন মা।

আবার আশ্চর্যের বিষয়, এই মহান শিক্ষক নিজেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষার্থী। সন্তান জন্মের মুহূর্ত থেকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি প্রতিদিন শিখে চলেন। কখনো সন্তানের হাসি থেকে, কখনো তার কান্না থেকে, কখনো তার ভুল থেকে, কখনো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। তাই এই সত্য চিরকাল অম্লান থাকবে ‘পৃথিবীর সেরা শিক্ষক মা। পৃথিবীর সেরা ছাত্র-ছাত্রীও মা।’

মায়ের কোলে মানবসভ্যতার প্রথম পাঠ : কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিশুকে প্রথম কথা বলতে শেখায় না। কোনো গবেষণাগার তাকে প্রথম হাসতে শেখায় না। কোনো বিদ্যালয় তাকে প্রথম ভালোবাসার ভাষা শেখায় না।

একজন নবজাতক প্রথম শেখে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে। সে মায়ের কণ্ঠে নিরাপত্তা খুঁজে পায়, মায়ের স্পর্শে পৃথিবীকে চিনতে শেখে। ভাষাবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও শিশুবিকাশ নিয়ে বহু গবেষণায় দেখা গেছে যে, শিশুর প্রাথমিক ভাষা, আবেগ, নিরাপত্তাবোধ ও সামাজিক আচরণের ভিত্তি জীবনের প্রথম কয়েক বছরে গড়ে ওঠে। সেই ভিত্তি নির্মাণে পরিবারের, বিশেষ করে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একজন মায়ের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত সন্তানের ব্যক্তিত্বে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

মা শেখান মানুষ হওয়ার শিক্ষা : বিদ্যালয় গণিত শেখায়, বিজ্ঞান শেখায়, ইতিহাস শেখায়। কিন্তু মানুষ হওয়ার শিক্ষা কোথায় পাওয়া যায়? এই শিক্ষা শুরু হয় ঘর থেকে।

মা শেখান সত্যের জন্য দাঁড়াতে, অন্যের কষ্ট বুঝতে, ভুল স্বীকার করতে, ক্ষমা করতে, পরিশ্রমকে সম্মান করতে, লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে, কৃতজ্ঞ হতে, নিজের বিবেককে অনুসরণ করতে। এই শিক্ষাগুলোই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি।

মাতৃত্ব- একটি অবিরাম শিক্ষা : মাতৃত্ব এমন একটি যাত্রা যার কোনো সমাপনী পরীক্ষা নেই, কোনো সনদ নেই, তবু প্রতিদিন নতুন পাঠ রয়েছে। প্রথম সন্তান জন্মালে মা শেখেন কীভাবে একটি প্রাণকে নিরাপদ রাখতে হয়। সন্তান স্কুলে গেলে শেখেন কীভাবে তার বন্ধু হতে হয়। কৈশোরে শেখেন কীভাবে শাসন ও ভালোবাসার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। যৌবনে শেখেন কীভাবে সন্তানের স্বাধীনতাকে সম্মান করতে হয়।

সন্তান নিজে বাবা বা মা হলে, তখনও তিনি শেখেন নতুন প্রজন্মের পরিবর্তিত বাস্তবতা। এই শেখার কোনো শেষ নেই। একজন মা কখনো নিজেকে সম্পূর্ণ মনে করেন না একজন সত্যিকারের মা প্রায়ই ভাবেন ‘আমি কি আরও ভালো করতে পারতাম?’

মা ও জাতি গঠন : একটি জাতির উন্নয়ন শুধু অর্থনীতি দিয়ে নয়, তার নাগরিকদের চরিত্র দিয়েও পরিমাপ করা হয়। যদি ঘরে ঘরে এমন মা থাকেন, যাঁরা সন্তানকে সততা, ন্যায়, মানবিকতা, দেশপ্রেম এবং দায়িত্ববোধ শেখান। তবে সেই জাতিকে দুর্নীতি, সহিংসতা বা অন্যায় দীর্ঘদিন গ্রাস করতে পারে না। তাই জাতি গঠনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামো নয় মায়ের শিক্ষা।

আজকের পৃথিবী মায়ের নতুন চ্যালেঞ্জ : বর্তমান যুগ তথ্যের যুগ, আবার বিভ্রান্তিরও যুগ। শিশু আজ শুধু বই থেকে নয়, মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকেও শিখছে। এ অবস্থায় একজন মাকে হতে হবে সচেতন শিক্ষার্থী।

উপসংহার : ইতিহাসে রাজাদের নাম লেখা থাকে, বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার লেখা থাকে, কবিদের কবিতা লেখা থাকে। কিন্তু অসংখ্য মহান মানুষের জীবনের নেপথ্যে যে নীরব মহীয়সী নারীরা তাঁদের গড়ে তুলেছেন, তাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় বড় করে লেখা থাকে না। অথচ তাঁদের অবদান ছাড়া সেই ইতিহাসই হয়তো সৃষ্টি হতো না।

তাই আসুন, আমরা মায়ের প্রতি সম্মানকে শুধু একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি দিনে ধারণ করি।

কারণ- মা প্রথম শিক্ষক, মা আজীবনের শিক্ষার্থী, মা প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, মা প্রথম মানবিক বিদ্যালয়, মা প্রথম ভালোবাসা, মা প্রথম সভ্যতা। আর তাই, নিঃসংকোচে, নিঃসন্দেহে এবং গভীর শ্রদ্ধায় উচ্চারণ করি- ‘পৃথিবীর সেরা শিক্ষক মা। পৃথিবীর সেরা ছাত্র-ছাত্রীও মা।’

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন